অস্বাভাবিক এই যানজট দূর করতে হবে

:: ড. কাজী এরতেজা হাসান ::

রোজার মাস এলেই দেশের মানুষ দুটো ক্ষেত্রে বড়ো বেশি হিমশিম খায়। তার মধ্যে একটি নিত্যপণ্যের দাম তো আছেই আরেকটি হচ্ছে এ মাসে যানজট অস্বাভাবিক রকম বেড়ে যাওয়া। এমনিতেই সারা বছরই এই যানজট তো আছেই তার ওপর রোজার মাস এলেই এই যানজট যেন আরো দশগুণ বেশি বেড়ে যায়। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় এই যানজটের মাত্রা অত্যধিক বেশি দেখা যায়। এতো বেশি যে, রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়কগুলোতে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় নাকডাকা ঘুম দিয়ে পড়ে থাকতে হয়। কিন্তু যাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে তারা তো এই যানজটের কারণে একধরনের মানসিক চাপের মধ্যেই থাকেন।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এরকম মানসিক চাপ থেকে নানা ধরনের রোগ হতে পারে। এতো গেল শারীরিক সমস্যার বিষয়। কিন্তু এতে করে যে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কীরকম চাপ পড়ে তা শুনলে তো চোখ কপালে উঠার যোগাড়। বুয়েটের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগরীতে যানজটে প্রতিদিন নষ্ট হয় ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা। ২০১৭ সালে একই ধরনের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ঢাকায় প্রতিদিন যানজটে ৩৮ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। অর্থাৎ এক বছরে যানজটে ১২ লাখ কর্মঘণ্টা বেশি নষ্ট হচ্ছে। এই যানজটে বার্ষিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। এই অঙ্ক জাতীয় বাজেটের ১১ শতাংশের ১ শতাংশ। বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট বলছে, নগরের যানজট যদি ৬০ শতাংশ কমানো যায়, তাহলে ২২ হাজার কোটি টাকা বাঁচানো যাবে। কিন্তু এই যানজট কীভাবে কমানো যাবে? আমাদের এখানে প্রধান সমস্যা হচ্ছে রাস্তার স্বল্পতা। আমরা যদি আমাদের এই প্রিয় শহরকে উন্নত শহরের কাতারে দেখতে চাই তাহলে এ জন্য কমপক্ষে ২৫ শতাংশ উন্নত সড়কের প্রয়োজন।

পক্ষান্তরে আমাদের এখানে রয়েছে মাত্র ৭.৮ শতাংশ। এটা যে কেবল উড়াল সড়ক নির্মাণ করে সম্ভব নয় তা বাস্তব ক্ষেত্রে ইতোমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কে যেরকম ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট দেখা যায় তা তো বিশ্বের কোনো উন্নত দেশে কল্পনাই করা যায় না। আমাদের এখানে আরেকটি সংকট হচ্ছে মাত্রাহীনভাবে প্রাইভেট গাড়ি বেড়ে চলা। এখানে উন্নত দেশের তুলনায় যারা নিতান্ত গরিব তারাও দু’তিনটা প্রাইভেট গাড়ি ব্যবহার করেন। যে দেশের মাত্র ৭.৮ শতাংশ ভালো সড়ক রয়েছে সেখানে প্রতিদিন গড়ে দেড়শ নতুন গাড়ি নামছে এতে করে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে তা তো সহজেই অনুমেয়। এতো গেল প্রাইভেট গাড়ির কথা এ ছাড়া গণপরিবহনের ক্ষেত্রে রয়েছে যে, এখানে বহু চালকদের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। ফিটনেসবিহীন গাড়িও অবলীলায় চলে যাচ্ছে। আর আছে রাস্তায় যত্রতত্র খোঁড়াখুঁড়ির কাজ। যে কারণে সড়কগুলো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বহু ফুটপাত রয়েছে হকারদের দখলে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে কিন্তু এই যানজট নিরসনে কোনো উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আমরা রাজধানী ঢাকাকে আর বছরের পর বিশ্বের নিকৃষ্ট শহরের তালিকায় দেখতে চাই না। দেশের অর্থনীতির উন্নতি যেখানে দৃশ্যমান সেখানে রাজধানী শহরের উন্নতিও তেমন দৃশ্যমান প্রত্যাশিত। এজন্য শুধু একটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা সেবা সংস্থাই নয়, পরস্পর স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সবগুলো সেবা খাতকে সমন্বিতভাবেই কাজ করতে হবে এর উন্নয়নে।

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here